প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৩

পিন্টু কর্মকার

    সাহিত্য -সংস্কৃতি, রাজনীতি ও আমিত্ব





সমাজের আলো অন্ধকার সবটাই উঠে আসে সাহিত্য সংস্কৃতির পাতায়, কিন্ত ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে আগের চেয়েও এখন সাহিত্য সংস্কৃতিতে 'আমি' 'আমি' বিষয়টা এতটাই বেশি হয়ে গেছে যেখানে মানুষের কল্যাণের দিক অপেক্ষা আত্মপ্রচার ও আত্মপ্রতিষ্ঠাই মুখ্য।

এই অস্থির সময়ের বুকে রাজনীতি এমনভাবে পা রেখে দাড়িয়ে আছে, যে কোনো কিছুই প্রায় রাজনীতির সঙ্গে সমঝোতা না করে এগোতে পারে না। তাই সব শিল্পী,সাহিত্যিক রাজনীতির হাত ধরে নিজেদের খ্যাতির গ্রাফরেখা উন্নত করতে চায়। বর্তমানে সাহিত্য ও শিল্পের নানা ক্ষেত্রে যে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত প্রতিভার বিচারে নয়…রাজনৈতিক স্নেহ-ছোঁয়ায়!


 শুধু বড় মঞ্চ নয় পাড়া গাঁ বা ব্লক এলাকার বিভিন্ন জায়গাতেও বিষয়টা একই রকম। সমস্যাটা হচ্ছে তাঁদের যারা শিল্পী হিসেবেই বাঁচতে চায় রাজনীতির হাওয়া এড়িয়ে।

আমাদের আশেপাশে যে সরকারি অনুষ্ঠানগুলো হয়, সেখানেও রাজনীতির ছোঁয়া-ঘেষারায় ডাক পায়, যতই তারা ঘষামাজা হউক!

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে এলাকার অন্যতম প্রতিভাধর শিল্পীই একেবারে অর্বাচীন। তবে যে শুধু রাজনীতিকরণ থাকে তা নয়, আমিত্বের বৃত্ততাও বিশাল।


অর্থনীতি নির্ভর পৃথিবীতে মানুষ সবকিছু থেকেই অর্থ উপার্জনের পথ খোঁজে। তাই সরকারি অনুষ্ঠানে শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারলেই মেলে কিছু সাম্মানিক!যা পাওয়ার জন্য কেউ নিজেকে জাহির করতে পাশের অরাজনৈতিক মৌলিক -শিল্পীকেই ঢেকে দিতে কোনো না কোনো অন্যায় কৌশলের সুড়ঙ্গ বেছে নেয়, ফলে সাহিত্য সংস্কৃতির মত পরিসরেও রাজনীতি ও আমিত্ব বড় হয়ে ওঠে!



শুক্রবার, ১০ নভেম্বর, ২০২৩

পিয়াংকী মুখার্জী



মাছবিক্রেতার আঁশটে দেহেই কি ব্রহ্মচর্য ?  



 



ভ্রমরের পাশে যদি এসে বসে একপশলা বৃষ্টি আর একটি স্বস্তিকচিহ্ন, এযাবৎ কালের সঞ্চিত সমস্ত দারুচিনি দ্বীপ থেকে যদি খসে পড়ে ঘুঙুরঘর তাহলে কি ঠাঁই হয় রাস্তার কোণে? গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময়  মানুষও যে গাছ হয়ে যেতে পারে সেই ধারণাটুকু জনসমক্ষে বিলিয়ে দিয়ে কি আদতেও  জন্ম দেয়া যায় প্রসবঘরের দেওয়াল ? পাঁচিলের গায়ে এই যে স্যাঁতসেঁতে ভোর আর  মৎস্য সংগ্রহকারীর হাতের ছাপ, এরা সত্যিই কি  মাছ বিক্রির পর নৌকায় করে ভাসিয়ে দেন বর্জ্য আঁশ ? 


এইসব ছাইপাঁশ প্রশ্নের রাস্তায় কাঁটাতারের বেড়া, 'প্রবেশ নিষিদ্ধ 'দেখার পর ফিরে যায় লোকজন । সাথে তাদের বাচ্চাকাচ্চা গরুবাছুর আর কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।  চশমার ডাঁটি অথবা মশা মারার ধূপ অথবা টর্চের ব্যাটারি...


সমুদ্রস্নান সেরে গায়ের বালি ঝাড়ার মুহূর্তে আচমকা মনে হয়  এই যে বাড়তি ফেনাটুকু বা ভিজে কাপড়ে লেগে থাকা অতিরিক্ত বালি, এসব বোধহয় ভিখিরি জন্মের ঘটি কেনাবেচা ছাড়া আর কিচ্ছু নয়


সূর্য অস্ত যাবার পরমুহূর্তেই জীবন টিয়ার খাঁচা, মাছবিক্রেতার হাঁড়ির খবরে কানকোর রক্তজাল। ঐ জালই কি অদৃশ্য ঘেরাটোপ ?  ঘেরাটোপের বাইরে সবাই নাবিক। আর নাবিকের থেকে এক ইঞ্চির দূরত্বে সকলেই ফেরবার জলচর।  


বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২২

প্রণতি গায়েন

'মুক্তির আকাশে  মৃণাল'

 


 

"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর

    অর্ধেক তার সৃজিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর"।

-এই বিশ্ব সৃষ্টির মূল আধার হলো নারী ও পুরুষ।তাই এই বিশ্বচালনায় উভয়েরই প্রয়োজন।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পুরুষ ও নারীকে সমান শক্তি বা সামর্থ্য যদিও দেননি, তবুও শৌর্য বীর্যে বুদ্ধিতে,স্নেহ-মায়া-মমতায় নারীর সামঞ্জস্য মেলা ভার।ঋগ্বেদে যে নারী ছিল 'গৃহিনী গৃহমূচ্যতে'বা 'সচিব সখী শিষ্যে ললিতে কলাবিধৌ'-সেই গৃহিনীই আবার স্মৃতিশাস্ত্রে হয়ে গেলেন'পূত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা'!

এখানে মনু লিখেছেন--'ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যে মর্হতি' অর্থাৎ দিনরাত নারীকে পুরুষের অধীন হতে হবে।ওদের সৃষ্টি কেবল পুত্র সৃষ্টির জন্য।তিনি তাঁর 'মনুসংহিতা'য়-'নারীবন্দনা' প্রসঙ্গে জানিয়েছেন-- ‌‌‌

"যত্র নার্য্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতা

যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্ব্বাসূত্রাফল ক্রিয়া।"

অর্থাৎ তিনি নারীদের অনাদর না করে নারীরা পরিবারে সম্মানিত একথা বলেছেন।যেখানে নারীরা অসম্মানিত সেখানে যাজ্ঞযজ্ঞাদি সমস্ত ব্যর্থ ।নারী সম্মান পেলে দেবতারাও প্রসন্ন।মনুসংহিতা য় বিধৃত নারীর প্রাত্যহিক আচ‍রিত ধর্ম সম্পর্কে সচেতন রমনী একমাত্র তার প্রতি এরূপ সম্মাননা।তাঁর মতে বিবাহই একমাত্র নারীর বৈদিক উপনয়ন,পতিসেবা তার গুরুগৃহে

বাসের মতো।গৃহকর্ম সাঁঝ সকালের হোমযজ্ঞের সামিল।তবে তাদের সমস্ত শাস্ত্র অধ্যয়নের অধিকার নেই, নেই বেদ পাঠের অধিকার।তাহলে শাস্ত্রজ্ঞানহীন,স্বাধীন অর্থকারী বৃত্তিহীন প্রথাগত শিক্ষাহীন নারীদের ধনসঞ্চয়ের অধিকার ও নেই।তাঁর মতে;--

"পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা পক্ষিতি যৌবনে

     রক্ষতি স্হবিরে পুত্রান স্ত্রী স্বাতন্ত্র্য মর্হতি।"

এরা কুমারী অবস্হায় পিতা, যৌবনে স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন।তাহলে নারী্র নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য কোথায়?পরাধীনতাই তার নিদান!আর এই পরাধীনতার বাঁধন যে,নারী মনে প্রাণে বরণ করে মানিয়ে নিতে পারবে -সেই পাবে তার প্রাপ্য পারিবারিক স্বীকৃতি।এখানেই নারীর অব্যক্ত যন্ত্রণা--"নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার?" যেখানে নারী দ্বারা সৃষ্টি সচল ,সেখানে অধিকারের বেলায় কেন তাকে ছিনিয়ে নিতে হবে?কেন এত অত্যাচার, কেন এত বঞ্চনা-অবিচার?যেখানে বিশ্ব সুন্দর নারীদের নিয়ে ই,সেখানে কেন আকাশে বাতাসে এত নারীদের ক্রন্দন রোল ? কেন পুরুষ হবে বিধানদাতা,নিয়ন্ত্রা ও স্বেচ্ছাচারী?আর নারী কেন শুধু ভোগ্য বস্তু রূপে বিরাজিতা?

এইরকমই পরিবেশে সৃষ্ট রবীন্দ্রনাথের একটি নারী চরিত্র 'স্ত্রীর পত্র'-এ 'মৃণাল'।অসম্ভব ব্যক্তিত্বময়ী প্রতিবাদী নারী বলেই যে সংসারী হতে পারেনি, কারণ নিয়ম না মানলেই এ সংসার তো তাকে নিমেষে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ডাস্টবিনে।যদিও ডাস্টবিনে ফেলার আগেই আত্মসম্মান নিয়ে মুক্তির খোঁজে বেরিয়েছে মৃণাল।এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রতিবাদী নারীর মুক্তির গ়ল্প।

এই গল্পটি সবুজপত্রে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২১বঙ্গাব্দে।এই গল্পে সমস্তটাই পাঠকের সামনে এসছে মৃণালের পত্র রচনার মধ্যে দিয়ে।নারীর যে অস্তিত্ব দাসীর সমান বা তার ও কম বললেই চলে,যা একমাত্র মৃণালকে করেছে ক্ষতবিক্ষত।যে সমাজ নারীকে মর্যাদা না দিয়ে শুধু অবহেলা বঞ্চনা দেয়,সেই নির্দয় পুরুষ সমাজের দিকে প্রতিবাদের তর্জনী তুলেছে মৃণাল।রূঢ়,কর্কশ, নিষ্ঠুর সমাজের সঙ্গে প্রতিমুহুর্তে আত্মমর্যাদার জন্য লড়াই করতে জানা এক প্রতিবাদী নারী-– মৃণাল।যে হয়ত সমাজে ব্যাধের মতো আক্রান্ত পিশাচদের হাত থেকে অসহায় বিন্দুকে বাঁচাতে পারেনি কিন্তু এই পুরুষ শাসিত সমাজকে ধিক্কার দিয়ে এক কাপড়ে

সাতাশ নম্বর মাখন বড়াললেনের পিঞ্জর থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ত আকাশের স্নিগ্ধ বাতাস নিতে পেরেছে।মুখ্যত এটি একটি পত্র,তাতে আদ্যপান্ত শুধু পরিবারের নীতিকথা,কিন্তু তিলতিল করে গড়া এক নারী্র হৃদয় কোমলতা- কঠোরতায় যা সংপৃক্ত ,তা আশ্রয় দিয়েছে এক সমপীড়িত ভিতু বালিকাকে।যে সমাজ নারী প্রগতির প্রতিরোধের

প্রাচীর ,তা ভেঙে মৃণাল এনেছে বিদ্রোহের ধ্বজা।সেদিক থেকে নিঃসন্দেহে এটি একটি শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদী নারী চরিত্র।যা রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের মাধ্যমে বাস্তবে এমন ই নারী চেয়েছিলেন।

গত পনোরো বছর বিবাহ হলে ও মৃণাল কোনোদিন স্বামীকে পত্র লেখেনি বা লেখার সুযোগ পায়নি।আজ তীর্থ করতে এসে স্বামীকে পত্র লিখছে। তবে এ চিঠি বাড়ির মেজবউসুলভ নয় - এ চিঠি এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীর।যাকে পরিবারের প্রথম বউ-এর রূপ নেই বলে সূদূর  বাংলাদেশের পল্লী থেকে আনা হয়েছিল রূপে - গুনে অতুলনীয়া এই মৃণালকে। তবে বিধাতপুরুষ যেন একুট বেশিইরকম বুদ্ধি দিয়ে ফেলেছিলেন একে - যার খেসারত হিসেবে তাকে 'মেয়ে জ্যাঠা' বলে দুবেলা গালমন্দও খেতে হয়েছে। পরিবারের অজান্তে মৃণাল তার সমস্ত অভিব্যক্তি কবিতা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করত। সমাজের সবার প্রতি তার মায়া এমন কি গরু বাছুরের প্রতিও। ইশ্বর এক মেয়ে জন্ম দিয়েই কেড়ে নিলে ফলে এই দুঃখ ভুলতে সে গরু বাছুর নিয়েই মেতে উঠল। এই সময় বড় জায়ের বোন বিন্দু তার ভাইয়ের অত্যাচারে দিদির বাড়ি এলে মৃণাল ছাড়া বাকি সবাই তার প্রতি বিরক্ত এমনকি বড়জাও। বড়জার যদিও করার কিছু ছিল না - তার না ছিল রূপ, না ছিল গুণ। মৃণাল কিন্তু বিন্দুকে কাছে টেনে নিলে বড়জা বিপদ ডেকে আসা হল বলে এই ভাব দেখালেন। বিন্দু এল ভয়ে ভয়ে - তা দেখে মৃণালের দুঃখ হল। এমন কী  তার গায়ে লাল দাগ দেখে ঘামাচি ভাবলে তখন সবাই বললো এ বসন্ত। তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে মৃণাল তাকে আঁতুর ঘরে নিয়ে থাকতে চাইল। অবশেষে বিন্দুর দাগ মিলিয়ে গেল - আশ্রয়হীনাকে যমেও অরুচি কী না? এইসময় বিন্দু মৃণালকে বেশি করে আঁকড়ে ধরল। বিন্দুর প্রতি মৃণালের এই স্নেহ-ভালোবাসা বাড়ির সবার কাছে অসহ্য বাড়াবাড়ি মনে হলে, সবার রাগ এসে পড়ল বিন্দুর ওপর। স্বদেশী হাঙ্গামায় বিন্দুর হাত আছে মনে করা হলো। এই সময় মৃণাল আলাদা দাসী রাখলে তার স্বামী হাত খরচার টাকা বন্ধ করে দিল । মৃণাল খরচ কমাতে কোরাকলের ধুতি পড়তে লাগল এবং মতির মাকেও তার বাসন মাজতে নিষেধ করল। এদিকে বিন্দুর ব‌‌য়স বাড়লে জোর করে বিন্দুকে একটি পাগলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো। বিন্দু মৃণালের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললে যেদিন মৃণাল বিশ্বাস করলেও বাড়ির কেউ বিশ্বাস করলে না যে, বিন্দুর স্বামী পাগল। বিন্দুর ভাসুর জোর করে তাকে নিয়ে গেলে মৃণাল প্রতিবাদ করে; কিন্তু বিন্দু এই বাদ-প্রতিবাদে মৃণালের কথা ভেবেই ভাসুরের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দেয়।

ইতিমধ্যে মৃণালের ভাই শরৎ কলকাতায় পড়তে এলে মৃণাল তাকে বিন্দুর খবরের জন্য নিয়োগ করল। শরৎ দুবার এফ.এ.ফেল করেছে শুধু সমাজসেবা করতে গিয়ে - পড়ার চেয়ে ভোলেন্টিয়ারি করা, প্লেগের পাড়ায় ইঁদুর মারা, বন্যায় ছোটদের - এসব তার কাজ ছিল। একদিন মৃণাল স্বামীর কাছে শুনল বিন্দু বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে আর তার জন্য তার ভাসুর খোঁজ করতে এসেছে । শরৎ খবর নিতে গিয়েছিল - যে সে তার ভাইয়ের বাড়িতে গেলে সেখান থেকে বিন্দুকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এদিকে খুরিমা শ্রীক্ষেত্র যাবেন বলে মৃণালের শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন। মৃণালও জোর করে ধরল জেদ সেও যাবে। বুধবার যাওয়ার দিন, রবিবার সব ঠিকঠাক - মৃণাল শরৎকে দায়িত্ব দিয়েছিল - যেমন করে হোক বিন্দুকে খুঁজে পুরীর গাড়ীতে তুলে দিতে হবে। শরৎ ও সঙ্গে যেতে চায়। সেইদিনই শরৎ এসে খবর দিল আগের দিন রাত্তিতে বিন্দু কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরেছে। মৃণালের জন্য একটা চিঠিও রেখে গেছে - কিন্তু ওরা তা নষ্ট করেছে, বড়ো জা লুকিয়ে ঘরের ভিতর কাঁদলেন, আর নিজেকে সান্তনা দিলেন '-" সে মরেছে বইতো নয়, বেঁচে থাকলে কত কী হতে পারত।' দেশশুদ্ধ লোক মেয়েদের কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরাকে একটা ফ্যাশন বললো।

মৃণাল তীর্থে এসেছে, বিন্দুর আর আসার প্রয়োজন হলো না। মৃণাল পতিদেবতাকে এ  পত্রে লিখছে - তাকে কোনো বদনাম নয়। লিখছে সেই সাতাশ নম্বর মাখন বড়াল গলিতে আর সে ফিরবে না। বিন্দুকে দেখে সে শিরায় শিরায় অনুভব করেছে এ সংসারে মেয়েমানুষের কী পরিচয় ? বিন্দুর মৃত্যু মৃণালকে আর বেড়ার মধ্যে থাকতে দিলো না। এই মেজো বউয়ের খোলস ছিন্ন করতে তাই তার এক নিমেষও সময় লাগেনি। আজ আর ওই গলিকে ভয় নেই। মাথার ওপর নীল আকাশ, স্বামীর ঘরের যে অভ্যাসের নাগপাশ তাকে অন্ধকারে ঘিরে রেখেছিল সে আজ তা ছিন্ন করে বাইরে এসে দেখল - গৌরব রাখার জায়গা নেই। মৃণাল মরতে যাচ্ছে তার স্বামী যেন একথা মনে না করেন। পুরোনো ঠাট্টা সে করবে না। মিরাবাঈ ও তো তার মতো মেয়ে ছিলেন। তাঁর শেকলও কম ভারী ছিল না। তাই তাঁর গানে বাপ ছাড়ুক, মা ছাড়ুক কিন্তু মীরার গানে লেগে রইল প্রভু। মৃণাল বাঁচবে ---

"সে তো কোনো সামান্য নারী নয় -

  নহি দেবী, নহি সামান্য নারী

পূজা করি মোরে রাখিবে উর্ধ্বে যে নহি নহি,

হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি।

যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সঙ্কটে সম্পদে,

সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে,

পাবে তবে তুমি চিনি‌‌তে মোরে"

এরকম ব্যক্তিত্বময়ী নারী তিনি, নিজের জীবনের কথা তাই স্বামীকে প‌ত্রে স্পষ্ট করে বোঝাতে যায়। গুরুত্ব বুঝতে পারলে তো মৃণালের উপযুক্ত স্বামীর অভাব হোত না? অবশ্য মৃণাল স্বামীর দোষ দেখেনি। তবে স্ত্রীকে ও যে স্বামীর উপযুক্ত হতে হবে - এ ধারনা মৃণাল ভেঙে দিয়েছে। তার কথায় ভঙ্গিতে বোঝা যায় স্বামীকেও স্ত্রীর উপযোগী হয়ে উঠতে হবে। এখানেই তো মুস্কিল। বিধাতা পুরুষ তো যতটা বুদ্ধি দরকার তার থেকে বেশি মৃণালকে দিয়েছেন।তাই তো গৃহমুখে বারবার ঘাত-প্রতিঘাত যা অন্য জায়ের ক্ষেত্রে ঘটেনি।আর এই উপস্থিত বুদ্ধিতে জাগিয়ে রাখতে সে নানা বাধা বিপত্তির মুখে পড়েছে।এখন ও নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, কখনও পরিবারের মানুষের শব্দভেদি বাণের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে মৃণালের বুদ্ধিদীপ্ত তেজ আরো শানিত হয়েছে।

দ্বিতীয় জবানবন্দি একটি ছোট পঙক্তিতে বিবৃত হয়েছে। গুরুত্বের দিক থেকে যা অসাধারণ। মৃণালের উদ্ধৃতি--- "আমার একটা জিনিস তোমাদের ঘরকন্নার বাইরে ছিল, সেটা কেউ তোমরা জাননি। আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতুম। সে ছাইপাশ যাই হোকনা, সেখানে তোমাদের অন্দর মহলের পাঁচিল ওঠেনি। সেইখানেই আমার মুক্তি, সেইখানেই আমি আমি। আমার মধ্যে যা কিছু তোমাদের মেজোবউকে ছাড়িয়ে রয়েছে সে তোমরা পছন্দ করনি।চিনতেও পারনি, আমি যে কবি সে পনেরো বছরে ও তোমাদের কাছে ধরা পড়ে নি"। এই নীরব কবিত্ব - তাকে আলাদা এক অস্তিত্ব দিয়েছে।সুখ-দুঃখ, ব্যাথা-বেদনা সব প্রকাশের একান্ত মাধ্যম এটাই। এ তার একান্ত অভ্যন্তরীণ শুধু তারই মনোজগত এটা। এর প্রকাশ নেই! এই পুরুষশাসিত সমাজের আধিক্য তার বুদ্ধিটাকে ভোঁতা করে দিয়েছে, সমাজের প্রচলিত রীতি যে - সে মানতে অপারগ। এমনকী গতানুগতিক জীবনস্রোতে চলতে বাধ‍্য হয়েছে।সন্তানটি হয়ে মারা যাওয়ার পর থেকেই মৃণাল অন্যরকমভাবে নারী প্রগতি কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করতে চেষ্টা করেছে। বিন্দুর মতো নিরাশ্রয় মেয়েদের আশ্রয় দেওয়াও তার মধ্যে একটি। যদিও এর জন্য প্রচুর কটাক্ষ মৃণালকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তবু ও সমাজের পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গিয়ে বিন্দুকে বাঁচাতে পারেনি - এখানেই তার ক্ষোভ। এক পাগলের সঙ্গে বিন্দুর বিয়ে হলো অথচ কেউ একথা বিশ্বাস করল না একমাত্র মৃণাল ছাড়া; তার দিদিও ভাগ্যের দোহাই দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে - 'কপালে দুঃখ থাকলে কেউ খন্ডাতে পারবেনা' বলে দিদি হয়ে কোনো বাঁচানোর চেষ্টা না করে শুধু ভাগ্যের দোহাই দিয়েই দায়িত্ব শেষ। অথচ মৃণাল তার ভাইকে নিয়োজিত করেও বিন্দুকে বাঁচাতে সক্ষম হলো না। মৃত্যু এসে সমস্ত প্রচেষ্টা মৃণালের ব্যর্থ করে তাকে হারিয়ে দিল। তবে এখান থেকে মৃণালের জ্ঞানচক্ষুর উন্মাচন !জীবনের মুক্তির পথ খোঁজা শুরু। এ মৃত্যু তার ভেতরের ঐশ্বরিক প্রতিবাদী শক্তিকে বের করে এনে এক নিমেষে সমস্ত কর্তব্য তুচ্ছ করে সাতাশ নম্বর মাখন বড়াল লেনের গলিকে অগ্রাহ্য করতে শেখাল। এখানেই এক নারীর প্রতিবাদে গল্পের সমাপ্তি। যে কথাগুলি একজন নারীর অন্তরের গভীরে গুমরে গুমরে মরছিল আজ তা পত্রাকারে বিস্ফোরিত হলো। সেই ব্যথিত অকথিত বাণী কলমের খোঁচাই হলো বাঙময়। এমনি এক নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থা মৃণালের মতো আমাদের অজস্র নারীকে বলি হতে হয়। যেখানে নির্দয় পুরুষরা মেয়েদের আজও ভোগ্যরূপে ভাবে, আজও নারীদের স্বাধীন ইচ্ছে নেই, আজও ছেলেরা বিয়ে করে আর নারীদের বিয়ে হয়।আজও নিরুপমারা, হৈমন্তীরা গোপনে কেঁদে আত্মবিসর্জন দেয়, আজও ভোরের জার্নাল খুলতেই বধূহত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, নারিপাচার, কন্যা ভ্রূণ হত্যা।আজও মেয়েদের নিজস্ব কোনও পরিচয় নেই। কে যেন বিদ্রুপ হেসে বলেছিল ----

"বাবার বাড়ি এই গেরামে, শ্বশুর বাড়ি ওই

তোমার বাড়ি কয় গো নারী, তোমার বাড়ি কই"

এই স্বতন্দ্র পরিচয় লাভের উদ্দেশ্যই - মুক্তি পাওয়ার জন্যই মৃণালের এই পত্রলিখন। তার অভিপ্রায় নারীকে আপন অধিকার নিজেকেই অর্জন করতে হবে, এ সমাজ তাকে দেবে না। তাই আত্মবিসর্জন নয় একমাত্র মৃণালই দেখিয়েছে - এই সংসারের সমস্ত নিয়মের বেড়াজাল ছিন্ন করে মুক্তির পথ দেখে আপন স্বতন্ত্রতায় বাঁচা যায়। এরজন্য অফুরন্ত মননশক্তি  তো একা মৃণালের পক্ষে ভাঙা সম্ভব না - এর জন্য নারীদের নিজেদেরই অগ্রণী হয়ে সে দায়িত্ব নিতে হবে।যা মৃণালের ছিল সে একা এই অচলায়তন ভেঙে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছে। আমরা মৃণালের এই পত্রের মাধ্যমে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পায় নির্দয় পুরুষ সমাজের কাছে নারীর সামান্য অধিকার দাবি করতে হয়, সে সমাজের কাছে এই প্রত্যাশাটুকু ছেড়ে দিয়ে প্রত্যেক মেয়েরই উচিৎ আপন জ্ঞানচক্ষুর আলোকে দেখে-নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আর এই বিপ্লবীমনের পরিচয়ই পাই মৃণাল চরিত্রে। যে কিনা এই পত্র শেষে অচলায়তনকে ভেঙে তুলছে বিদ্রোহের ধ্বজা - যা প্রত্যেক মেয়েরই প্রেরণার উৎস প্রগতির গতি।তবে এখানে বলার মেয়েরা যদি নিজেদের অধিকার, সম্মান নিজেরা বুঝে নিতে সক্ষম না হয়,সচেতন না হয়,তবে অদূর ভবিষ্যতে তাদের পরিণতি আরো ভয়াবহ হবে।তাই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের মাধ্যমে তাঁর মানস প্রতিবাদী নারীদের আমাদের সামনে এনে আমাদের চোখ খুলে দিতে চেয়েছেন।তিনি কিন্তু সমাজকে একটা নিরপেক্ষ প্রণ দিতে চেয়েছিলেন যে,নারীর স্বাধীনতার মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়,তার ভাবনাকে সম্মান করে,তার ভালো কাজে একটু নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা-,এগুলো ও কী একান্ত অভিপ্রেত নয়?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 'মুক্তির আকাশে  মৃণাল'

 

 

"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর

    অর্ধেক তার সৃজিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর"।

-এই বিশ্ব সৃষ্টির মূল আধার হলো নারী ও পুরুষ।তাই এই বিশ্বচালনায় উভয়েরই প্রয়োজন।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা পুরুষ ও নারীকে সমান শক্তি বা সামর্থ্য যদিও দেননি, তবুও শৌর্য বীর্যে বুদ্ধিতে,স্নেহ-মায়া-মমতায় নারীর সামঞ্জস্য মেলা ভার।ঋগ্বেদে যে নারী ছিল 'গৃহিনী গৃহমূচ্যতে'বা 'সচিব সখী শিষ্যে ললিতে কলাবিধৌ'-সেই গৃহিনীই আবার স্মৃতিশাস্ত্রে হয়ে গেলেন'পূত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা'!

এখানে মনু লিখেছেন--'ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যে মর্হতি' অর্থাৎ দিনরাত নারীকে পুরুষের অধীন হতে হবে।ওদের সৃষ্টি কেবল পুত্র সৃষ্টির জন্য।তিনি তাঁর 'মনুসংহিতা'য়-'নারীবন্দনা' প্রসঙ্গে জানিয়েছেন-- ‌‌‌

"যত্র নার্য্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতা

যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্ব্বাসূত্রাফল ক্রিয়া।"

অর্থাৎ তিনি নারীদের অনাদর না করে নারীরা পরিবারে সম্মানিত একথা বলেছেন।যেখানে নারীরা অসম্মানিত সেখানে যাজ্ঞযজ্ঞাদি সমস্ত ব্যর্থ ।নারী সম্মান পেলে দেবতারাও প্রসন্ন।মনুসংহিতা য় বিধৃত নারীর প্রাত্যহিক আচ‍রিত ধর্ম সম্পর্কে সচেতন রমনী একমাত্র তার প্রতি এরূপ সম্মাননা।তাঁর মতে বিবাহই একমাত্র নারীর বৈদিক উপনয়ন,পতিসেবা তার গুরুগৃহে

বাসের মতো।গৃহকর্ম সাঁঝ সকালের হোমযজ্ঞের সামিল।তবে তাদের সমস্ত শাস্ত্র অধ্যয়নের অধিকার নেই, নেই বেদ পাঠের অধিকার।তাহলে শাস্ত্রজ্ঞানহীন,স্বাধীন অর্থকারী বৃত্তিহীন প্রথাগত শিক্ষাহীন নারীদের ধনসঞ্চয়ের অধিকার ও নেই।তাঁর মতে;--

"পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা পক্ষিতি যৌবনে

     রক্ষতি স্হবিরে পুত্রান স্ত্রী স্বাতন্ত্র্য মর্হতি।"

এরা কুমারী অবস্হায় পিতা, যৌবনে স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন।তাহলে নারী্র নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য কোথায়?পরাধীনতাই তার নিদান!আর এই পরাধীনতার বাঁধন যে,নারী মনে প্রাণে বরণ করে মানিয়ে নিতে পারবে -সেই পাবে তার প্রাপ্য পারিবারিক স্বীকৃতি।এখানেই নারীর অব্যক্ত যন্ত্রণা--"নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার?" যেখানে নারী দ্বারা সৃষ্টি সচল ,সেখানে অধিকারের বেলায় কেন তাকে ছিনিয়ে নিতে হবে?কেন এত অত্যাচার, কেন এত বঞ্চনা-অবিচার?যেখানে বিশ্ব সুন্দর নারীদের নিয়ে ই,সেখানে কেন আকাশে বাতাসে এত নারীদের ক্রন্দন রোল ? কেন পুরুষ হবে বিধানদাতা,নিয়ন্ত্রা ও স্বেচ্ছাচারী?আর নারী কেন শুধু ভোগ্য বস্তু রূপে বিরাজিতা?

এইরকমই পরিবেশে সৃষ্ট রবীন্দ্রনাথের একটি নারী চরিত্র 'স্ত্রীর পত্র'-এ 'মৃণাল'।অসম্ভব ব্যক্তিত্বময়ী প্রতিবাদী নারী বলেই যে সংসারী হতে পারেনি, কারণ নিয়ম না মানলেই এ সংসার তো তাকে নিমেষে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ডাস্টবিনে।যদিও ডাস্টবিনে ফেলার আগেই আত্মসম্মান নিয়ে মুক্তির খোঁজে বেরিয়েছে মৃণাল।এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রতিবাদী নারীর মুক্তির গ়ল্প।

এই গল্পটি সবুজপত্রে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২১বঙ্গাব্দে।এই গল্পে সমস্তটাই পাঠকের সামনে এসছে মৃণালের পত্র রচনার মধ্যে দিয়ে।নারীর যে অস্তিত্ব দাসীর সমান বা তার ও কম বললেই চলে,যা একমাত্র মৃণালকে করেছে ক্ষতবিক্ষত।যে সমাজ নারীকে মর্যাদা না দিয়ে শুধু অবহেলা বঞ্চনা দেয়,সেই নির্দয় পুরুষ সমাজের দিকে প্রতিবাদের তর্জনী তুলেছে মৃণাল।রূঢ়,কর্কশ, নিষ্ঠুর সমাজের সঙ্গে প্রতিমুহুর্তে আত্মমর্যাদার জন্য লড়াই করতে জানা এক প্রতিবাদী নারী-– মৃণাল।যে হয়ত সমাজে ব্যাধের মতো আক্রান্ত পিশাচদের হাত থেকে অসহায় বিন্দুকে বাঁচাতে পারেনি কিন্তু এই পুরুষ শাসিত সমাজকে ধিক্কার দিয়ে এক কাপড়ে

সাতাশ নম্বর মাখন বড়াললেনের পিঞ্জর থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ত আকাশের স্নিগ্ধ বাতাস নিতে পেরেছে।মুখ্যত এটি একটি পত্র,তাতে আদ্যপান্ত শুধু পরিবারের নীতিকথা,কিন্তু তিলতিল করে গড়া এক নারী্র হৃদয় কোমলতা- কঠোরতায় যা সংপৃক্ত ,তা আশ্রয় দিয়েছে এক সমপীড়িত ভিতু বালিকাকে।যে সমাজ নারী প্রগতির প্রতিরোধের

প্রাচীর ,তা ভেঙে মৃণাল এনেছে বিদ্রোহের ধ্বজা।সেদিক থেকে নিঃসন্দেহে এটি একটি শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদী নারী চরিত্র।যা রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের মাধ্যমে বাস্তবে এমন ই নারী চেয়েছিলেন।

গত পনোরো বছর বিবাহ হলে ও মৃণাল কোনোদিন স্বামীকে পত্র লেখেনি বা লেখার সুযোগ পায়নি।আজ তীর্থ করতে এসে স্বামীকে পত্র লিখছে। তবে এ চিঠি বাড়ির মেজবউসুলভ নয় - এ চিঠি এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীর।যাকে পরিবারের প্রথম বউ-এর রূপ নেই বলে সূদূর  বাংলাদেশের পল্লী থেকে আনা হয়েছিল রূপে - গুনে অতুলনীয়া এই মৃণালকে। তবে বিধাতপুরুষ যেন একুট বেশিইরকম বুদ্ধি দিয়ে ফেলেছিলেন একে - যার খেসারত হিসেবে তাকে 'মেয়ে জ্যাঠা' বলে দুবেলা গালমন্দও খেতে হয়েছে। পরিবারের অজান্তে মৃণাল তার সমস্ত অভিব্যক্তি কবিতা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করত। সমাজের সবার প্রতি তার মায়া এমন কি গরু বাছুরের প্রতিও। ইশ্বর এক মেয়ে জন্ম দিয়েই কেড়ে নিলে ফলে এই দুঃখ ভুলতে সে গরু বাছুর নিয়েই মেতে উঠল। এই সময় বড় জায়ের বোন বিন্দু তার ভাইয়ের অত্যাচারে দিদির বাড়ি এলে মৃণাল ছাড়া বাকি সবাই তার প্রতি বিরক্ত এমনকি বড়জাও। বড়জার যদিও করার কিছু ছিল না - তার না ছিল রূপ, না ছিল গুণ। মৃণাল কিন্তু বিন্দুকে কাছে টেনে নিলে বড়জা বিপদ ডেকে আসা হল বলে এই ভাব দেখালেন। বিন্দু এল ভয়ে ভয়ে - তা দেখে মৃণালের দুঃখ হল। এমন কী  তার গায়ে লাল দাগ দেখে ঘামাচি ভাবলে তখন সবাই বললো এ বসন্ত। তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে মৃণাল তাকে আঁতুর ঘরে নিয়ে থাকতে চাইল। অবশেষে বিন্দুর দাগ মিলিয়ে গেল - আশ্রয়হীনাকে যমেও অরুচি কী না? এইসময় বিন্দু মৃণালকে বেশি করে আঁকড়ে ধরল। বিন্দুর প্রতি মৃণালের এই স্নেহ-ভালোবাসা বাড়ির সবার কাছে অসহ্য বাড়াবাড়ি মনে হলে, সবার রাগ এসে পড়ল বিন্দুর ওপর। স্বদেশী হাঙ্গামায় বিন্দুর হাত আছে মনে করা হলো। এই সময় মৃণাল আলাদা দাসী রাখলে তার স্বামী হাত খরচার টাকা বন্ধ করে দিল । মৃণাল খরচ কমাতে কোরাকলের ধুতি পড়তে লাগল এবং মতির মাকেও তার বাসন মাজতে নিষেধ করল। এদিকে বিন্দুর ব‌‌য়স বাড়লে জোর করে বিন্দুকে একটি পাগলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলো। বিন্দু মৃণালের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললে যেদিন মৃণাল বিশ্বাস করলেও বাড়ির কেউ বিশ্বাস করলে না যে, বিন্দুর স্বামী পাগল। বিন্দুর ভাসুর জোর করে তাকে নিয়ে গেলে মৃণাল প্রতিবাদ করে; কিন্তু বিন্দু এই বাদ-প্রতিবাদে মৃণালের কথা ভেবেই ভাসুরের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দেয়।

ইতিমধ্যে মৃণালের ভাই শরৎ কলকাতায় পড়তে এলে মৃণাল তাকে বিন্দুর খবরের জন্য নিয়োগ করল। শরৎ দুবার এফ.এ.ফেল করেছে শুধু সমাজসেবা করতে গিয়ে - পড়ার চেয়ে ভোলেন্টিয়ারি করা, প্লেগের পাড়ায় ইঁদুর মারা, বন্যায় ছোটদের - এসব তার কাজ ছিল। একদিন মৃণাল স্বামীর কাছে শুনল বিন্দু বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে আর তার জন্য তার ভাসুর খোঁজ করতে এসেছে । শরৎ খবর নিতে গিয়েছিল - যে সে তার ভাইয়ের বাড়িতে গেলে সেখান থেকে বিন্দুকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এদিকে খুরিমা শ্রীক্ষেত্র যাবেন বলে মৃণালের শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন। মৃণালও জোর করে ধরল জেদ সেও যাবে। বুধবার যাওয়ার দিন, রবিবার সব ঠিকঠাক - মৃণাল শরৎকে দায়িত্ব দিয়েছিল - যেমন করে হোক বিন্দুকে খুঁজে পুরীর গাড়ীতে তুলে দিতে হবে। শরৎ ও সঙ্গে যেতে চায়। সেইদিনই শরৎ এসে খবর দিল আগের দিন রাত্তিতে বিন্দু কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরেছে। মৃণালের জন্য একটা চিঠিও রেখে গেছে - কিন্তু ওরা তা নষ্ট করেছে, বড়ো জা লুকিয়ে ঘরের ভিতর কাঁদলেন, আর নিজেকে সান্তনা দিলেন '-" সে মরেছে বইতো নয়, বেঁচে থাকলে কত কী হতে পারত।' দেশশুদ্ধ লোক মেয়েদের কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরাকে একটা ফ্যাশন বললো।

মৃণাল তীর্থে এসেছে, বিন্দুর আর আসার প্রয়োজন হলো না। মৃণাল পতিদেবতাকে এ  পত্রে লিখছে - তাকে কোনো বদনাম নয়। লিখছে সেই সাতাশ নম্বর মাখন বড়াল গলিতে আর সে ফিরবে না। বিন্দুকে দেখে সে শিরায় শিরায় অনুভব করেছে এ সংসারে মেয়েমানুষের কী পরিচয় ? বিন্দুর মৃত্যু মৃণালকে আর বেড়ার মধ্যে থাকতে দিলো না। এই মেজো বউয়ের খোলস ছিন্ন করতে তাই তার এক নিমেষও সময় লাগেনি। আজ আর ওই গলিকে ভয় নেই। মাথার ওপর নীল আকাশ, স্বামীর ঘরের যে অভ্যাসের নাগপাশ তাকে অন্ধকারে ঘিরে রেখেছিল সে আজ তা ছিন্ন করে বাইরে এসে দেখল - গৌরব রাখার জায়গা নেই। মৃণাল মরতে যাচ্ছে তার স্বামী যেন একথা মনে না করেন। পুরোনো ঠাট্টা সে করবে না। মিরাবাঈ ও তো তার মতো মেয়ে ছিলেন। তাঁর শেকলও কম ভারী ছিল না। তাই তাঁর গানে বাপ ছাড়ুক, মা ছাড়ুক কিন্তু মীরার গানে লেগে রইল প্রভু। মৃণাল বাঁচবে ---

"সে তো কোনো সামান্য নারী নয় -

  নহি দেবী, নহি সামান্য নারী

পূজা করি মোরে রাখিবে উর্ধ্বে যে নহি নহি,

হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে সে নহি নহি।

যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সঙ্কটে সম্পদে,

সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে সহায় হতে,

পাবে তবে তুমি চিনি‌‌তে মোরে"

এরকম ব্যক্তিত্বময়ী নারী তিনি, নিজের জীবনের কথা তাই স্বামীকে প‌ত্রে স্পষ্ট করে বোঝাতে যায়। গুরুত্ব বুঝতে পারলে তো মৃণালের উপযুক্ত স্বামীর অভাব হোত না? অবশ্য মৃণাল স্বামীর দোষ দেখেনি। তবে স্ত্রীকে ও যে স্বামীর উপযুক্ত হতে হবে - এ ধারনা মৃণাল ভেঙে দিয়েছে। তার কথায় ভঙ্গিতে বোঝা যায় স্বামীকেও স্ত্রীর উপযোগী হয়ে উঠতে হবে। এখানেই তো মুস্কিল। বিধাতা পুরুষ তো যতটা বুদ্ধি দরকার তার থেকে বেশি মৃণালকে দিয়েছেন।তাই তো গৃহমুখে বারবার ঘাত-প্রতিঘাত যা অন্য জায়ের ক্ষেত্রে ঘটেনি।আর এই উপস্থিত বুদ্ধিতে জাগিয়ে রাখতে সে নানা বাধা বিপত্তির মুখে পড়েছে।এখন ও নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, কখনও পরিবারের মানুষের শব্দভেদি বাণের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে মৃণালের বুদ্ধিদীপ্ত তেজ আরো শানিত হয়েছে।

দ্বিতীয় জবানবন্দি একটি ছোট পঙক্তিতে বিবৃত হয়েছে। গুরুত্বের দিক থেকে যা অসাধারণ। মৃণালের উদ্ধৃতি--- "আমার একটা জিনিস তোমাদের ঘরকন্নার বাইরে ছিল, সেটা কেউ তোমরা জাননি। আমি লুকিয়ে কবিতা লিখতুম। সে ছাইপাশ যাই হোকনা, সেখানে তোমাদের অন্দর মহলের পাঁচিল ওঠেনি। সেইখানেই আমার মুক্তি, সেইখানেই আমি আমি। আমার মধ্যে যা কিছু তোমাদের মেজোবউকে ছাড়িয়ে রয়েছে সে তোমরা পছন্দ করনি।চিনতেও পারনি, আমি যে কবি সে পনেরো বছরে ও তোমাদের কাছে ধরা পড়ে নি"। এই নীরব কবিত্ব - তাকে আলাদা এক অস্তিত্ব দিয়েছে।সুখ-দুঃখ, ব্যাথা-বেদনা সব প্রকাশের একান্ত মাধ্যম এটাই। এ তার একান্ত অভ্যন্তরীণ শুধু তারই মনোজগত এটা। এর প্রকাশ নেই! এই পুরুষশাসিত সমাজের আধিক্য তার বুদ্ধিটাকে ভোঁতা করে দিয়েছে, সমাজের প্রচলিত রীতি যে - সে মানতে অপারগ। এমনকী গতানুগতিক জীবনস্রোতে চলতে বাধ‍্য হয়েছে।সন্তানটি হয়ে মারা যাওয়ার পর থেকেই মৃণাল অন্যরকমভাবে নারী প্রগতি কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করতে চেষ্টা করেছে। বিন্দুর মতো নিরাশ্রয় মেয়েদের আশ্রয় দেওয়াও তার মধ্যে একটি। যদিও এর জন্য প্রচুর কটাক্ষ মৃণালকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তবু ও সমাজের পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গিয়ে বিন্দুকে বাঁচাতে পারেনি - এখানেই তার ক্ষোভ। এক পাগলের সঙ্গে বিন্দুর বিয়ে হলো অথচ কেউ একথা বিশ্বাস করল না একমাত্র মৃণাল ছাড়া; তার দিদিও ভাগ্যের দোহাই দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে - 'কপালে দুঃখ থাকলে কেউ খন্ডাতে পারবেনা' বলে দিদি হয়ে কোনো বাঁচানোর চেষ্টা না করে শুধু ভাগ্যের দোহাই দিয়েই দায়িত্ব শেষ। অথচ মৃণাল তার ভাইকে নিয়োজিত করেও বিন্দুকে বাঁচাতে সক্ষম হলো না। মৃত্যু এসে সমস্ত প্রচেষ্টা মৃণালের ব্যর্থ করে তাকে হারিয়ে দিল। তবে এখান থেকে মৃণালের জ্ঞানচক্ষুর উন্মাচন !জীবনের মুক্তির পথ খোঁজা শুরু। এ মৃত্যু তার ভেতরের ঐশ্বরিক প্রতিবাদী শক্তিকে বের করে এনে এক নিমেষে সমস্ত কর্তব্য তুচ্ছ করে সাতাশ নম্বর মাখন বড়াল লেনের গলিকে অগ্রাহ্য করতে শেখাল। এখানেই এক নারীর প্রতিবাদে গল্পের সমাপ্তি। যে কথাগুলি একজন নারীর অন্তরের গভীরে গুমরে গুমরে মরছিল আজ তা পত্রাকারে বিস্ফোরিত হলো। সেই ব্যথিত অকথিত বাণী কলমের খোঁচাই হলো বাঙময়। এমনি এক নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থা মৃণালের মতো আমাদের অজস্র নারীকে বলি হতে হয়। যেখানে নির্দয় পুরুষরা মেয়েদের আজও ভোগ্যরূপে ভাবে, আজও নারীদের স্বাধীন ইচ্ছে নেই, আজও ছেলেরা বিয়ে করে আর নারীদের বিয়ে হয়।আজও নিরুপমারা, হৈমন্তীরা গোপনে কেঁদে আত্মবিসর্জন দেয়, আজও ভোরের জার্নাল খুলতেই বধূহত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, নারিপাচার, কন্যা ভ্রূণ হত্যা।আজও মেয়েদের নিজস্ব কোনও পরিচয় নেই। কে যেন বিদ্রুপ হেসে বলেছিল ----

"বাবার বাড়ি এই গেরামে, শ্বশুর বাড়ি ওই

তোমার বাড়ি কয় গো নারী, তোমার বাড়ি কই"

এই স্বতন্দ্র পরিচয় লাভের উদ্দেশ্যই - মুক্তি পাওয়ার জন্যই মৃণালের এই পত্রলিখন। তার অভিপ্রায় নারীকে আপন অধিকার নিজেকেই অর্জন করতে হবে, এ সমাজ তাকে দেবে না। তাই আত্মবিসর্জন নয় একমাত্র মৃণালই দেখিয়েছে - এই সংসারের সমস্ত নিয়মের বেড়াজাল ছিন্ন করে মুক্তির পথ দেখে আপন স্বতন্ত্রতায় বাঁচা যায়। এরজন্য অফুরন্ত মননশক্তি  তো একা মৃণালের পক্ষে ভাঙা সম্ভব না - এর জন্য নারীদের নিজেদেরই অগ্রণী হয়ে সে দায়িত্ব নিতে হবে।যা মৃণালের ছিল সে একা এই অচলায়তন ভেঙে মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছে। আমরা মৃণালের এই পত্রের মাধ্যমে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পায় নির্দয় পুরুষ সমাজের কাছে নারীর সামান্য অধিকার দাবি করতে হয়, সে সমাজের কাছে এই প্রত্যাশাটুকু ছেড়ে দিয়ে প্রত্যেক মেয়েরই উচিৎ আপন জ্ঞানচক্ষুর আলোকে দেখে-নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আর এই বিপ্লবীমনের পরিচয়ই পাই মৃণাল চরিত্রে। যে কিনা এই পত্র শেষে অচলায়তনকে ভেঙে তুলছে বিদ্রোহের ধ্বজা - যা প্রত্যেক মেয়েরই প্রেরণার উৎস প্রগতির গতি।তবে এখানে বলার মেয়েরা যদি নিজেদের অধিকার, সম্মান নিজেরা বুঝে নিতে সক্ষম না হয়,সচেতন না হয়,তবে অদূর ভবিষ্যতে তাদের পরিণতি আরো ভয়াবহ হবে।তাই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের মাধ্যমে তাঁর মানস প্রতিবাদী নারীদের আমাদের সামনে এনে আমাদের চোখ খুলে দিতে চেয়েছেন।তিনি কিন্তু সমাজকে একটা নিরপেক্ষ প্রণ দিতে চেয়েছিলেন যে,নারীর স্বাধীনতার মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়,তার ভাবনাকে সম্মান করে,তার ভালো কাজে একটু নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা-,এগুলো ও কী একান্ত অভিপ্রেত নয়?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  

সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১

সুমন ব্যানার্জী

বাংলা রাজনৈতিক কবিতার ভুবন ও মণিভূষণ ভট্টাচার্য

 

১.

 

   'ঝড়ের খেয়া' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে - " 'যাত্রা করো,যাত্রা করো যাত্রীদল'/উঠেছে আদেশ - /'বন্দরের কাল হল শেষ।' "

 

      প্রথম মহাযুদ্ধের অগ্নিস্রাবী প্রেক্ষিতে রচিত এই কবিতায় ক্রান্তদর্শী কবি এক নতুন সময়কে প্রত্যক্ষ করছেন।'নূতন সমুদ্রতীর পানে' বেরিয়ে পড়ার আহ্বান।ঊনবিংশ শতকের আদর্শ সংস্কার ভেঙেচুরে দিচ্ছে নতুন জীবন তরঙ্গের অভিঘাত।

 

       প্রথম মহাযুদ্ধ ও তজ্জনিত উদ্ভূত পরিস্থিতি গোটা বিশ্বের সমীকরণ বদলে দিয়েছিল।অর্থনৈতিক সঙ্কট,দারিদ্র পাশাপাশি দেশব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন নতুন শক্তি সঞ্চয় করে। এরপরেই আসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আবারও এক মর্মান্তিক অভিঘাত। সাংস্কৃতিক জগতেও এর ব্যাপক প্রভাব এসে পড়েছিল।চিরায়ত প্রেম, প্রকৃতি ও ঈশ্বর নির্ভর ভাববাদ এবং রোম্যান্টিসিজম্'র বদলে শিল্প-সাহিত্য জগতের ধৃতিকেন্দ্রে চলে আসে সমাজ বাস্তবতার ধারণা।অর্থাৎ অতীত সময়ের সঙ্গে একটা গ্রন্থিচ্ছেদন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।ঠিক এই সময় থেকেই বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিকতা ও সমাজ-বাস্তবতার দর্শন বড় জায়গা করে নেয়। জীবনানন্দ-উত্তর বাংলা কবিতায় এক সর্বংসহ প্রতিভা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।তাঁর হাত ধরেই বাংলা কবিতায় প্রবল হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। জীবনানন্দের অতি-ব্যবহারে ধ্বস্ত রূপকল্প ও ইমেজকে ছেড়ে তিনি তৈরি করলেন এক কাব্যভাষা।কবিতাকে নিয়ে গেলেন একদম মাটির পৃথিবীতে।মুটে মজুর,শ্রমিক কৃষক,গণ অভ্যুত্থান,জীবন সংগ্রামের কথা উঠে এলো কবিতায়,যা বাংলা কবিতায় আগে কখনও আসেনি।বাংলা কবিতার আকাশে দেখা দিল এক নতুন দিগন্ত রেখা।ছন্দ,আঙ্গিক ও কবিতার ভাষা নিয়ে শুরু হল নিরন্তর নানা মাত্রিক পরীক্ষা।'পদাতিক','অগ্নিকোণ','চিরকূট' প্রভৃতি কাব্য এক অলৌকিক স্পন্দন জাগিয়েছিল গোটা জনমানসে।সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি আরও একজনের নাম এই প্রসঙ্গে প্রাতঃস্মরণীয় তিনি হলেন 'কবি কিশোর' সুকান্ত ভট্টাচার্য। বাংলা রাজনৈতিক কবিতার ধারাটিকে তিনিই লোকপ্রিয়তার তুঙ্গে বিন্দুতে নিয়ে যান।অকালে নির্বাপিত এই বিস্ময়কর কবি প্রতিভার হাত দিয়ে বেরিয়েছিল 'ছাড়পত্র','ঘুম নেই','মিঠে কড়া'র মত বই।যা বয়ে এনেছিল অনেক তরতাজা সম্ভাবনা, প্রতিশ্রুতি ও অনমনীয় অঙ্গী।              

 

২.

   "কাল যে বিপ্লবী ছিল আজ সে-ই মন্ত্রী হয়,

 

     মন্ত্রীত্ব গোয়ালে হয় বহুরূপী নেতা

 

     কাল যে ঘাতক ছিল আজ সে-ই প্রকল্প

 

     প্রণেতা।"

 

     কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য'র কবিতা। যাঁর কবিতার আলোচনায় প্রায় উপেক্ষিত ও অকর্ষিত।এমন তীব্র ব্যঙ্গ,কৌতুক,শাণিত শ্লেষ এবং এমন নির্মেদ ভণিতাহীন উচ্চারণ বাংলা রাজনৈতিক কবিতার ধারায় খুব কমই চোখে পড়ে।সমাজে ঘটে চলা সীমাহীন ভন্ডামি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে মানুষ ও সমাজকে বিক্রয়যোগ্য পণ্য করে তোলার বিরুদ্ধে তাঁর কলম যেভাবে গর্জে উঠেছে তা মানুষের অন্তর্জগতকে জোরালো ধাক্কা দেয়।কবি তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন দ্ব্যর্থহীনভাবে - "আমি কমিটমেন্টে বিশ্বাস করি।প্রত্যেকটি লোকই কমিটমেন্টে বিশ্বাস করে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে কমিটমেন্টটা কোন দিকে ?শাসক শ্রেণির দিকে,না শোষিত শ্রেণির দিকে ?...আমি নিপীড়িতদের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করি এবং তাঁদের কথা ভেবেই লিখি।সুতরাং তাঁদের প্রতিই আমার কমিটমেন্ট।" (রৈবতক,জুন,১৯৮৮)।

 

     'কয়েকটি কন্ঠস্বর' থেকে 'উৎকন্ঠ শর্বরী' পর্যন্ত পর্বে তিনি নিজের ভাবনার জমিটিকে ক্রমাগত কর্ষণ করে গেছেন।যা অনেক সংহত,পরিণত হয়েছে 'গান্ধিনগরের রাত্রি' কাব্যে পৌঁছে।আসলে গোটা ষাটের দশক থেকে তিনি রাজনীতির বাঁকগুলিকে লক্ষ করেছেন।এই সময় ভারত-চীন যুদ্ধ হয়েছে,খাদ্য আন্দোলন,গোটা বাংলা জুড়ে জোতদার শ্রেণির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট গণ আন্দোলন, জরুরি অবস্থা অতঃপর সত্তরের দশকের সেই উত্তাল রাজনীতি যার ধৃতিকেন্দ্রে ছিল নকশাল অভ্যুত্থান।এরপর কমিউনিস্ট পার্টি একাধিক ভাগে বিভাজিত হয়।রাজনীতিতে আদর্শের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্ষমতা দখলের ঈপ্সা।তাঁর সঙ্গে বিশ্বায়ন ও বাণিজ্যায়নের হাওয়া এসে লাগে।সমাজে নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে চলে আসে কর্পোরেট পুঁজি।সেই সময় যাঁরা অবিচল আস্থা রেখেছিলেন কমিউনিস্ট জীবনাদর্শের প্রতি তাঁদের সকলের কাছেই এই সময়টা হয়ে ওঠে একটা স্বপ্নভঙ্গের দশক।তাই অবদমিত আকাঙ্ক্ষা,ক্ষোভ, বিশ্বাস ভঙ্গের যন্ত্রণা, ধিক্কার এই সমস্ত কিছু উঠে আসতে থাকে কবিতায়।

 

    সময়ের ক্ষতচিহ্নিত সামাজিক ও রাজনৈতিক কবিতা বাংলায় কম লেখা হয়নি কিন্তু মণিভূষণের কবিতার মত এত সংবেদী ও প্রবল পরিবহন খুব কম কবিতাতেই এসেছে।'গান্ধিনগরের রাত্রি'র কবিতাগুলি সেই রকমই যেন খাপ খোলা তলোয়ারের মত।চারজন ব্যক্তির বক্তব্যকে তুলে ধরে একটি কবিতা লেখেন;যা আসলে পুঁজি সর্বস্ব সমাজ কাঠামোর শ্রেণি অবস্থানের দিকেই সব্যঙ্গ ইঙ্গিত -

 

"অধ্যাপক বলেছিল, দ্যাটস্ র-ঙ্, আইন কেন

 

তুলে নেবে হাতে ?

 

মাস্টারের কাশি ওঠে কোথায় বিপ্লবে,শুধু

 

মরে গেল অসংখ্য হাভাতে !

 

উকিল সতর্ক হয়, 'বিস্কুট নিইনি, শুধু চায়ের

 

দামটা রাখো লিখে।'

 

চটকলের ছুকুমিঞা, ' এবার প্যাঁদাবো শালা

 

হারামি ও.সিকে'।"

 

এই কাব্যের সবচেয়ে পতাকাস্থানীয় কবিতা 'একটি স্লোগানের জন্ম' -

 

"উলঙ্গ ছেলে/গুলমার্গ থেকে বিবেকানন্দ শিলা পর্যন্ত থর থর করে কাঁপিয়ে দিয়ে/ভারতবর্ষের সমস্ত দক্ষিণ বাহিনী নদীকে/বাঁ দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে/সমস্ত অস্ত্র কারখানা,বিমান,বন্দর,সমস্ত বেনামি জমির দলিল/পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া, যৌন সাহিত্যে আগুন লাগিয়ে দিয়ে/বিশাল পর্বতমালা জলস্রোত মাঠ - ময়দানের সমস্ত/খরসান জমায়েতকে তিনটে শব্দের মধ্যে স্তব্ধ ভয়ঙ্কর তোলপাড় ক'রে/খাটিয়ার উপর লাথি মারতে মারতে তার/সুকেশিনী ধূর্ত সৎমাকে চিৎকার করে বললো/'ভাত দে হারামজাদী'।"

 

এই কবিতার সঙ্গে এক বাণবেঁধার বিন্দুতে এসে মিলে যায় শঙ্খ ঘোষের 'স্লোগান' ও জয়দেব বসু'র 'মায়াকোভস্কির শেষ সাতদিন' কবিতাটি।আসলে একটি কবিতা অন্য একটি কবিতা সৃজনের সময় কখন অনির্বাচিত আলোর মত কখনবা ধাত্রী হিসাবে কাজ করে।

 

৩.

 

  কবির ''দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়া'' কাব্যের 'দধীচি' কবিতায় পাই -

 

"কলম ছুঁড়ে দিয়ে ফরমটা ছিঁড়ে টুকরো

 

 টুকরো ক'রে সেক্রেটারির

 

মুখে উড়িয়ে দিয়ে চিৎকার ক'রে উঠলেন -

 

'স্কাউন্ড্রেলস, আমাকে এভাবে ইনসালট

 

করার মানে কী ?

 

আমি প্রাক্তন বিপ্লবী নই , এখনো বিপ্লবী।"

 

 

    বিপ্লবের জন্য দিন বদলের স্বপ্ন যাঁরা দু'চোখ ভরে দেখে ছিল তা হয়তো ব্যর্থ হয়েছে,চারিদিকে শুধু শূন্য আস্ফালন আর উন্মত্ততা তবু বুকের মধ্যে সেই বারুদ রয়ে গেছে।তিনি আজ যে ভারতবর্ষকে দেখছেন -

 

"আমি যখন বস্তির/গণতান্ত্রিক খাটা পায়খানায় লাইন দিতাম।/মা নিজের হাতে দেওয়া ঘুঁটে জ্বালিয়ে চা ক'রে দিতেন।/সেই স্যাঁতসেতে অন্ধকারে ধোঁয়াটে আগুনের সামনে/বসে থাকা মাকে আমার ভারতবর্ষ বলে মনে হতো।"

 

এই পৃথিবীকে নবজাতকের বাসযোগ্য করতে অপারগ যন্ত্রণাবিদ্ধ কবি লেখেন -

 

"পৃথিবীকে এই শিশুর বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না বলেই/রাজনৈতিক গাড়লরা শিশুটিকেই এই পৃথিবীর যোগ্য করে তুলেছে।"(শিশুটি বেড়ে উঠছে)।

 

    'সুকান্ত ভট্টাচার্যকে খোলা চিঠি' কবিতায় লিখছেন যে - "তুমি যে ভরপুর প্রাণের আবেগে লেনিন হতে চেয়েছিলে -/সেই তাঁকে নিয়েও এখন ভাগ বাঁটোয়ারা চলে : ফলে -/ভাগের মা গঙ্গা পায় না,/...সব কিছুই পণ্য -/...ভিখিরি মেয়েটির চিত্রকল্প ,/নিঃস্বের ন্যাকড়া কিংবা পন্ডিতের মগজ,/এমনকী তোমার জন্মদিনও/পণ্য।"

 

     ধনতন্ত্রের বল্গাহীন বিস্তার মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে, স্বাভাবিক মূল্যবোধকে পণ্যায়িত করেছে।সবকিছুকে অর্থের নিক্তিতে মাপতে শিখিয়েছে।যাঁরা দিন বদলের স্বপ্ন দেখেছিল,কলম হাতে তুলে নিয়েছিল,মানুষকে উদ্বোধিত করেছিল তাঁদের ইমেজকে গ্রাস করেছে এই পণ্য সভ্যতা।আদর্শের মৃত্যু হয়েছে তার বদলে চলছে কদর্য স্থূল উল্লাস আর ভন্ডামি।সে সুকান্ত এই পৃথিবীকে নবজাতকের বাসযোগ্য করতে চেয়েছিলেন সেখানে আজ -"পৃথিবীকে এই শিশুর বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না বলেই/রাজনৈতিক গাড়লরা শিশুটিকেই এই পৃথিবীর যোগ্য করে তুলেছে।" তাঁর 'কপাল' কবিতায় লিখছেন যে -" 'হঠাৎ হুঙ্কার দিলেন - 'মায়াকোভস্কির মত লিখুন।/কবিতায় জনগণের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে দিন।'.../আমি জানি আমার অক্ষম কবিতাগুলিই/আমার সবচেয়ে বড় শত্রু।/'কিন্তু কী করবো বলুন' - আমি/পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রের মত হতাশ হয়ে /তাঁকে জানালাম - 'মায়াকোভস্কির নেতা/ছিলেন স্বয়ং,/লেনিন।আর আমার নেতা হলেন আপনি।'

 

     জনগণের মধ্যে থেকেই আসলে নেতা তৈরি হয়।সেই প্রকৃত নেতা যাঁর সঙ্গে মাটি ও মানুষের ঐকান্তিক টান।গণ আন্দোলনের মধ্যে থেকেই উঠে আসে লেনিন,ট্রটস্কির মত নেতা:যে কোন বুলি আওড়াবে না কথা বলবে সাধারণ মানুষের ভাষায়।তাই কোন জনপ্রিয় নেতাকে নয় , কবি নেতা হিসাবে গণ্য করেছেন একজন খেটে খাওয়া মানুষকেই।যে তাঁকে উজ্জীবিত করবে।তাই মায়াকভস্কির মত কবিতা লেখার দরকার নেই তাঁর।এখানেই তিনি মানুষের কবি।স্বদেশের প্রতি নিবিড় ভালোবাসাও কি মর্মরিত হয় না এই কবিতায় ?

 

৪.

 

      কবির একটি অসামান্য কবিতা 'পদ্ধতি'।একজন কবি কীভাবে মানুষের মনোজগতের বদ্ধমূল সংস্কারকে ভেঙে দিয়ে আনতে পারে নতুন জীবন তরঙ্গ,কীভাবে তাঁর সৃষ্টি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শক্তিকে ইন্ধন জোগায় তাই এই কেন্দ্রীয় বিষয়।একজন মানুষ শুধু লেখে 'তার লেখা ভাবায় এবং জ্বালায়'।একদিন তাঁর ডান হাত কেটে নেওয়া হল।তখন সে বাঁ হাতে লেখা অভ্যাস করল।তখন সেটাও কেটে নেওয়া হল।তখন পাঠকরা বলল 'তুমি মুখে মুখে বলে দাও,আমরা লিখে নিচ্ছি।'সে সেটাই করল।খবর পেয়ে 'সরকারি জল্লাদ'রা তাঁর মুখের মধ্যে থু থু ছিটিয়ে গেল।তাঁর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হল 'দলা পাকানো ন্যাকড়া' ও 'সিমেন্ট' দিয়ে।তখন সেই লোকটি পাঠকদের ইশারায় বলল সমুদ্র তীরে যেতে সে ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে 'অন্তহীন বালি'র ওপর লিখবে।খবর পেয়ে 'ডালকুত্তারা' আবার নিঃশব্দে এসে তাঁর পা কামড়ে দিল।তখন সে শুধু হাসল বিরাট সমুদ্র সৈকতে।কারণ "এতদিনে তার জায়গায় তার চেয়েও বেশি/শক্তিশালী এবং দূরদর্শী/তিনজন লেখক/এসে গেছে।"

 

     একজন কবি কখন অস্ত্র ধরেন না তাঁর কলম হয়ে ওঠে অস্ত্রের চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ ও প্রভাবশালী।কোন রক্তপাতহীন ভাবেই সে প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেতনায় জ্বালিয়ে দিতে পারে শুদ্ধসত্ত্ব প্রেরণার প্রদীপ।

 

    আসলে রাজনৈতিক কবিতা তো চির যৌবনের।যৌবন জরাসন্ধের দুর্গ ভেঙে ফেলে উড্ডীন করে চির নবীনের জয়ধ্বজা।তথাকথিত শুদ্ধতার পরিখা,নিষেধের কাঁটাতারে ছিন্নভিন্ন করে এগিয়ে যেতে চায় কবিরা।‌বাংলা ভাষায় যাঁরা রাজনৈতিক কবিতা লিখেছেন তাঁরা বেশির ভাগই সনাতন ছন্দের কাঠামোকে ভেঙে টানটান গদ্যে লিখেছেন।প্রাত্যহিক যাপনের ব্যবহৃত চেনা-জানা শব্দ, নিতান্তই সাধারণ মেঠো প্রবচন ও বাক্-প্রতিমা প্রয়োগেই অনবদ্য সব সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন। বস্তুত এই আপাত অকাব্যিকতার মধ্যেই আছে মাটির পৃথিবীকে, বৃহত্তর জনজীবনের সংলগ্ন থাকার অঙ্গীকার।কোন মিস্টিক স্বপ্নলোকে বিচরণ করে নয়, প্রতিদিনের ঘাত-প্রতিঘাতে রক্তাক্ত মানুষের নিরন্তর উত্তাপকে ধরতে চেয়েছেন কবিতায়।তাই তো সময়ের ব্যঞ্জানায় ঋদ্ধ এই কবিতা হয়ে ওঠে ইতিহাসেরও প্রত্ন-আলেখ্য।আসলে এক কল্পনায় আচ্ছন্ন ইতিহাস।মণীন্দ্র রায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, গোলাম কুদ্দুস,রাম বসু,সিদ্ধেশ্বর সেন,অনন্য রায়,শঙ্খ ঘোষ, জয়দেব বসু,মল্লিকা সেনগুপ্ত, নবারুণ ভট্টাচার্য প্রমুখ কবিরা বাংলা রাজনৈতিক কবিতার মানচিত্রে নানা মাত্রায় ও বর্ণে কবিতা লিখে এই সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্যকে সজীব ও বেগবান রেখেছেন।

 

    আজ এই শৃগাল অধ্যুষিত মৃত্যু উপত্যকায় যখন আমাদের বিশ্বাসের ওপর, সৃষ্টির ওপর অনর্গল রক্ত ঝরে পড়ছে,পুড়ে খাক হচ্ছি আগুনে তখন এই সব কবিতাই হয়ে উঠতে পারে সংগ্রামের রক্তপাতহীন আয়ুধ।রাজনৈতিক ঘটনা চিহ্নিত কবিতা শুধু সময়ের ক্ষতকেই দেখিয়ে দেয় না,সজোরে ধাক্কা দেয় বিবেককে।এখানেই তার সার্থকতা।হিংসার বদলে হিংসাকে নয় বরং ছড়িয়ে দিতে বলে ভালোবাসার পরাগ রেণু। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়'র কথায় -

 

"এসো আমরা আগুনে হাত রেখে

 

 প্রেমের গান গাই।"(মুখে যদি রক্ত ওঠে) ।।

 

 

                         (সমাপ্ত)

 

 

  

 

 

 

 

 


সম্পাদকের কলমে

মাস আসে মাস যায়। বছর গড়ায় বুলেট ট্রেনের গতিতে। নিরীহ মানুষ, হাভাতে মানুষ, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ থাকে তার নির্দিষ্ট ঘূর্ণি আবর্তে। পৃথিবীর...