অনুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ মার্চ, ২০২৪

মহম্মদ আনওয়ারুল কবীর

 




অব্যক্ত


গভীর রাত। ওয়াড্রোব খুলে ভদ্রমহিলা আলতো করে স্পর্শ করেন সযত্নে রাখা ছোট্ট ছোট্ট জামা, মিকিমাউজের ছবি আঁকা একটি ফিডার আর ছোট্ট একজোড়া লাল জুতা। বেলকনি থেকে সিগারেটে সুখটান দিয়ে রুমে ঢুকেন ভদ্রলোক। স্ত্রীর পিঠে হাত রাখেন। সজল চোখে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে থাকেন। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারেন না। জানালার ফাঁক গলে হঠাৎ দুজনের চোখে পড়ে দূর-আকাশের মিটিমিটি তারা।




সময়চাবুক


নিশুতি রাত। ভেসে আসছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। টিনের চালে শুনা যাচ্ছে পাতা ঝরার মর্মর।


বাড়ির সবাই ঘুমে, ওরা দুজন ছাড়া। চলছে ওদের টুকরো টুকরো রাতের কথা।

- আজ একটু অন্যভাবে ...

- কীভাবে?

-এই যে দ্যাখো ...

-ধ্যাত

একসময় শীৎকারে ঢাকা পড়ে যায় কথোপকথন।


প্রপিতামহের দেয়ালঘড়িটা ওদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, 'সময়চাবুকে একদিন তোমাদের জোশও




মাশাআল্লাহ


হুজুর- জীবজন্তুর ছবি আঁকতে নেই! ছবিতে তো আর জান দিতে পারবা না- এজন্যই তো আল্লাহ প্রাণীর ছবি আঁকতে নিষেধ করেছেন।

চিত্রকর- ছবিতে আমি জান দিতে পারি না ঠিকই কিন্তু প্রাণ দিতে পারি। এই যে দেখুন আমার আঁকা ...


হুজুর ক্যানভাসে আঁকা নারীর শৈল্পিক উদোম তৈলচিত্রে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হয় - মাশাআল্লাহ!



ঈর্ষা

- এই,ফেইসবুকে  তোমার কবিতায় মেয়েদের এতো কমেন্ট আর লাইক কেন?

-  তাতে কী হয়েছে? মেয়েরা হয়তো আমার লেখা পছন্দ করে ...

- যত্তসব! আমি বুঝি না, কবিতা দিয়েই তুমি কচি থেকে বুড়ি-ধাড়ি সব মেয়েদের মাথা চিবিয়ে খাচ্ছো। তোমাকে আমি চিনি না! ...

- কী যা তা বলছো!

- আমাকে খুকি ভাবছো! ছোঁক ছোঁক করা ঐ  মেয়েরা প্রথমে  কবিতা ভালোবাসবে, তারপর কবিকে ভালোবাসবে, এরপর শুরু করবে টানাটানি। আজ থেকে কোন কবিতা পোষ্ট করতে পারবে না তুমি!


মাইয়া মানুষ


বাদল এক দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দেয়-


- বাজান, বাজান, আমাগোর পাটক্ষেতে একজন মানুষ মইরা পইড়া আছে, এহনই দেইখ্যা আইলাম।

- কী কস তুই, চল্ তো দেহি ......


রহমত মিঞা ছেলের হাত ধরে বাড়ির পিছনে পাটক্ষেতে যায়। বাদল পাটক্ষেতে আঙুল দিয়ে দেখায়, " ঐ যে দেহো, মানুষটা মইরা আছে।" বাদলের আঙুল অনুসরণ করে রহমত মিঞা পাটগাছের ঝোপের আড়ালে এক মহিলার লাশ দেখে। কাছে গিয়ে নীরিক্ষণ শুরু করে।


সাদা পেটিকোটে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ছেঁড়া ব্লাউজ গলিয়ে স্তনযুগল বেরিয়ে এসেছে। স্পষ্টতঃই নখের আঁচড় দেখা যাচ্ছে। নিথর দেহ। অনেক আগেই মারা গেছে বোঝা যায়। নাহ, পরিচিত কেউ না !


রহমত মিঞা এবার  দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে বলে, "হ্যা রে, মানুষ দেহোস কই তুই? এইডা তো মাইয়া মানুষ!"


সুমালী দাস চ্যাটার্জী

 উপলব্ধি



সদ্যকিশোরী রাইয়ের খুব মনখারাপ।

দুর্গাপূজায় বন্ধুদের কতগুলো নতুন জামা হয়েছে। অথচ তার মাত্র একটা জামা, তাও আবার সাধারণ, কমদামী। বন্ধুদের কাছে সে মুখ দেখাবে কি করে। রাই একবারও ভাবলো না যে তার বাবা সামান্য মাইনের চাকুরে। পুজোতে মা-বাবা নিজেদের জন্য কিছু কেনেননি কিন্তু আদরের একমাত্র মেয়েটার মুখে হাসি দেখার জন্য একটা নতুন জামা ঠিক কিনে নিয়ে এসেছেন। নতুন জামাটা দেখে কোনো আনন্দ‌ই পায় না রাই।

বারো বছর পর--

দুর্গাপূজায় কেনা দামী ডিজাইনার শাড়িগুলো দেখছিল মিসেস রাই মুখার্জী।

কলকাতার এক অভিজাত পরিবারের পুত্রবধূ এখন সে। অর্থের অহঙ্কার এই পরিবারের ভূষণ। জলভরা চোখে দামী
শাড়িগুলো দুহাতে তুলে ধরে কাছে আনে সে- উপলব্ধি করে ছোটোবেলার সেই জামাটাতে বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ অমূল্য ভালোবাসার স্পর্শ ছিল যা আজ হারিয়ে গেছে। দামী শাড়িটা দেখে তাই আর কোনো আনন্দ হয় না তার।


সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১

অনন্যা বন্দোপাধ্যায়


 

 

এক্স ইকোয়ালস টু

 

জানিস প্রেম করলে কষ্ট পেতে হয়,

হুম জানি তো ,

ও জানিস , তাহলে প্রেম করতে এসেছিস কেন ?

দুঃখ পেতে , সিম্পল –

 বাব্বা ঢং দেখো না মেয়ের ,সাধ করে দুঃখ পেতে এসেছে সে আমার কাছে—তা দুঃখ পেতে এসেছিসই বা কেন আমার কাছে ?

শোন প্রেম করে যত দুঃখ পাবো , সেই দুঃখের সকল ভাব কে মিশিয়ে দেবো আমার গানে , লোকে আমার গান শুনে বলবে সত্যি একটা গান শুনলাম বটে , এভাবে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছড়াবে আমার গান , লোকে আমার সত্তা কে জানবে , আমার গান শুনবে ।

 

যা যা পাগলী ,ভাগ এখান থেকে, উনি এসেছেন কিনা আমার সাথে প্রেম করে নিজের প্রতিষ্ঠা পেতে , উনি প্রতিষ্ঠা পাবেন , ইয়া বড় ইনোভা চড়ে ঘুরবেন ,আর আমি যে এতো দুঃখ দেবো , তাতে আমি কি পাবো ? আমি নেই এখানে , আমি চলি রে ---

 

আরে আরে দাঁড়া দাঁড়া কোথায় যাচ্ছিস ? তুই তো মহা পাগল আছিস – বলেই ওমনি মিডলটন স্ট্রীট এর দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলি , তোর কি দরকার ওই দিকে ?

 সব তোকে বলতে হবে নাকি ?

আচ্ছা ছাড় বলতে হবে না , ওই শোন ওই পান বিড়ির দোকান টার রেডিও থেকে গান ভেসে আসছে শুনেছিস ?

না অত সময় নেই আমার –

ধ্যাত খালি বাজে বকে , শোন মন দিয়ে – গাওয়া হ্যায় চাঁদ তারে গাওয়া হ্যায় –

ও সেই বস্তাপচা রোম্যানটিক গান ?

এই উলটোপালটা কনসেপ্ট ছাড়তো – আসল কথাটা শোন , আমি যদি তোর হাত ধরে কলকাতার ধুলো বালি মাখা রাস্তায় গান গাই গাওয়া হ্যায় , ইয়ে সারি ধুল অর প্রদুসন গাওয়া হ্যায় হামারে প্রেম কি , তো কেমন হয় ?

ওহ অসাম হবে , এই শোন চল প্রিন্সেপ ঘাটে যাই , যাবি ?  হ্যাঁ তুই যদি হাত ধরে নিয়ে যাস অবশ্যই যাবো –

তবে চল , এখন চক্র রেলের কামরাও ফাঁকা থাকে , চক্র রেলে চাপি খানিকক্ষণ –

সেই শিলু দার এক্স ইকোয়ালস টু প্রেমের মতো ?

একদম , ফাঁকা কামরায় তোর হাত ধরে।

তাই সত্যি ?

হুম খুউউউউউব সত্যি । কি মাখিস রে তুই ? এতো মিষ্টি গন্ধ আসে ?

বলব কেন ? সব কিছু জানতে হবে নাকি তোকে?

আচ্ছা জানবো না যা! বেশি জানতে গেলেই ডুবে যাব , না জানাই ভালো ।

ওই , ওই রাগ করলি ?

 দেখলি তো কথা বলতে বলতেই এসে গেলি প্রিন্সেপ ঘাট –

 উফফ এবার শুধু  অপেক্ষা একটা চক্র রেলের জন্য –

 ন্যাকামি করিস না , দেখ একটু পরেই এসে যাবে ।

একটু থাম এবার অনেক বকেছিস ।

উম বকবোই তো -

ম্যায় অউর মেরী উঁহু তেরি তনহাই -

 পাগলী -

ওই দেখ কু ঝিক ঝিক- চল

এক্স ইকোয়ালস টু প্রেম ধরে নিয়ে তোকে কষব।

  

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

কৃপাণ মৈত্র




বড়দিন

                  






শ্মশান ধারের মাঠে মেলা লোক জমেছে। হাসি ঠাট্টা মজামস্তির ফোয়ারা উড়ছে। বুড়ি আজ গ্ৰামের ভিক্ষা ছেড়ে হাজির হয়েছে রঙ্গালয়ে ।বুড়ি কানে কম শোনে।চোখেও ভালো দেখে না  ।বুুড়ি বুঝতে পারছে না  কেন এত মানুষ শ্মশানেধারে  জমায়েত হয়েছে।  কেনই বা শ্মশানের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে  গান-বাজনা হাসিঠাট্টার আনন্দে সকলে মেতে উঠেছে  ।বুুড়ির   আবছা চোখে কত রঙিন মানুষ।  কত কত আয়োজন দিনটিকে  উপভোগ করার  জন্য।শ্মশানের আত্মারা  শান্তি ভঙ্গের  বিচার চাইবে না তো জীবমৃতদের কাছে।

     একটা গাছ ঠাওরে  তার তলায় বসেছে  বুড়ি।ফিনফিনে ঠান্ডা বাতাস বইছে।  শীতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।  পরনের দীন পোশাকের সাধ‍্য কি উত্তরের বাতাসের অহংকে ঠেকায়। তুবুও বুড়ি

 নড়ে না। কীভাবে যেন বুড়ির বিশ্বাস জন্মেছে উদ্বৃত্তের আস্তাকুড় খুঁজে  ওরা নিশ্চয়ই  নাম কামাবার সুযোগ ছাড়বে না। বুড়ি মনটাকে স্থির করলো।  ভাবলো এত মানুষ, এত আগুন যখন  তখন ঠান্ডা যবর লাগার কথা নয়। বুড়ি যেখানে যায় সেখানে তো উষ্ণতার আদর জোটে না। বরং মানুষের মনুষ্যত্বকে অবমাননার সদর দরজা  দেখিয়ে দিয়ে তার পরমাত্মাকে  অবমাননা করে।

হট্টগোল ক্রমশ বাড়ছে। বুড়ির অশক্ত শ্রাবনকেও পীড়া দিচ্ছে।বুড়ি স্মৃতি হলটেও তো তার মেয়ে বেলার এমন বাঁধনছাড়া মজা মস্তির খবর পায় না।

   একজন এসে বলল ও ঠাকমা চলে যেও না যেন। কিছু না কিছু তো অবশ্যই বেশি হবে।

     বুড়ি বলে , হ্যাঁ বাবা , কুকুরগুলোর  সঙ্গে  আমাকেও ভাগ করে দিস ।তা বাবা  আজ কিসের উৎসব?

     ছেলেটি বলে, বড়দিন।

     বুড়ি অবাক হয়ে বলে।  বড়দিন! কই মালুম হচ্ছে না তো । এই তো সুজ্জি  উঠলো আর একটু বাদে যে  চোখের কোল জুড়ে আঁধার নেমে আসবে ।

   ছেলেটি বলে,  না না এ সে বড়দিন নয়।যিশুখ্রিষ্টৈর জন্মদিন।

   বুড়ি চালশে পড়া চোখে ফ্যালফ্যাল করে ছেলেটির দিকে তাকালে ছেলেটি বলে, সাহেবের জন্মদিন।

   বুড়ির দৃষ্টিতে কৌতূহল।  বুড়ি বলে ওরা না আমাদের গোলাম করে রেখেছিল। তবে বাবা সে ভালো ছিল ।পরের লাথি সওয়া যায় , নিজেরটা যে বড্ড বাজে ।

   ছেলেটি বলে, না না এ সে সাহেব নয়।

  বুড়ি বলে, তা বাবা ,রাম ঠাকুরের জন্মদিন ত কই এমন বড় দিন হল না ।অথচ ওই লোকটা অবহেলায় দিনটাকে বড় করে নিশ্চিন্তে বিছানায় পাঠাতে পারতেন।

    ছেলেটি বলে, রাম ঠাকুর!সে আবার কে !   

      বুড়ি মুখে হাসি ফুটে উঠল।বুড়ি কপালে জড়োহাত ঠেকিয়ে  বলে,  রামকেষ্ট ঠাকুর।  সারা জীবনের একটা ঘটনা ঘটবে না যেখানে না তার বাণী  তোমাকে পথ দেখাবে।

     ছেলেটি বলে, কে জানে হবে হয়তো।

    বুড়ি উঠে পড়ে। ছেলেটি বলে, ও ঠাকমা যেও না ।একটু রুখে যাও। মাছ,মাংস, মিষ্টি আরো কত কি। আমি না হয় তোমার জন্য সকলের আগে খাবারটা নিয়ে আসব।

   বুড়ি হনহনিয়ে হাঁটতে শুরুু করলে ছেলেটি বলে, কী হলো ঠাকমা চলে যাচ্ছ যে বড়।

   বুড়ি দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে, শ্মশান জাগিয়ে শব্দের এত বেলাল্লাপনা  যদি তোদের বড়দিন হয়, তাহলে রাম ঠাকুরের জন্মদিনকে  তোরা বড়দিন করিস না।

   বুড়ি অস্তায়মান সূর্যকে প্রণাম করে বলে, রাম ঠাকুর, এদের ক্ষমা করো।এরা জানে না এরা কী করছে।

কৃষ্ণেন্দু দাসঠাকুর




রেশটুকু





বৈশাখ মাস। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে।

  

---এ তুই বউয়ের গায়ে হাত দিয়েছিস-- থানার মেজোবাবু, সবচেয়ে রাগী পুলিশ অফিসার ইকবালের চুলের মুঠি ধরে ঝাকড়াতে ঝাকড়াতে বলল।

--হ্যাঁ স্যার।

ইকবাল শান্তভাবে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। ও জানে ওর স্ত্রী মানে মিলির মামা লালবাজারের বড়ো অফিসার। তাই ব্যাপারটা অনেকদূর এগোবে।

--দেখে তো ভদ্র ফ্যামিলির, এডুকেটর মনে হচ্ছে, তা গায়ে হাত দিলি কেন?

--স্যার। কত করে একটা রবীন্দ্র সংগীত শোনাতে বললাম শোনালে না।আমি ওর গান শুনেই বিয়ে করেছিলাম...আর কিচ্ছু...



ঝড়, বৃষ্টি ক্রমশ ম্রিয়মাণ হতে হতে একসময় সম্পূর্ণ থেমে গেল। পশ্চিমাকাশে তখন উজ্জ্বল আভাটুকু মুছে গেলেও... হালকা রেশটুকু রয়ে গেছে...

                                       


শ্যামল সরকার




টোপ


    



পিল পিল করে ছুটছে কাতারে কাতারে মানুষ ৷ পথ জুড়ে কেবল অফুরান মাথা ৷ রোদ্দুরে পুড়ে যাচ্ছে মাথা ও মন ৷ তবুও চলেছে মানুষ ৷ চলতেই হবে ৷ দলপতিরা সামনে রেখেছেন সুন্দর স্বপ্ন  ----- মুক্তি ৷ মেহের বিবি জিজ্ঞেস করল শক্ত করে হাত ধরে রাখা স্বামী মোক্তার আলীকে ----- আচ্ছা, আমরা কেন যাচ্ছি ? কোথায় ?

বৃদ্ধ মোক্তার হাঁফাতে হাঁফাতে বলল ---- বাঁচতে ৷

------- সেটা কোথায় ?

------- সামনেই কোথাও ৷



    বেশীক্ষণ হাঁটতে হল না ৷ লুটিয়ে পড়ল মোক্তার রাজপথে ৷ মেহের বিবি চিৎকার করে জড়িয়ে ধরল স্বামীকে ৷ কারো থামার সময় নেই ৷ অফুরান ছুটন্ত মানুষের পায়ের তলায় পিষে গেল প্রবীন দম্পতি ৷



   মিছিল চলছে ৷ সামনেই মুক্তি ৷ শাদা ধপধপে, গোলগাল, বরশির গায়ে বিঁধে থাকা একখন্ড সুন্দর মুক্তি ৷

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

সুদীপ ঘোষাল




পরশুরাম

 




নয় ছেলে আর পাঁচ মেয়েকে নিয়ে মিতা ও তার বর পাঁচবিঘে জমির আমবাগানে বেশ সুখেই ছিল। মিতার বর মিলিটারি বিভাগে কাজ করার সময় এক অত্যাচারী লম্পটকে মেরে জঙ্গলে পুঁতে ফেলেছিল। কেউ জানতে পারে নি। তারপর কয়েক বছর পরে চাকরি ছেড়ে তার শখের আমবাগানে চলে এল। একরাশ বৃষ্টিফোঁটার ঝাপটা লাগা সুখে সে মিতার সংসারে মেতে গেল। ছেলেরা ধীরে ধীরে বড় হল। একে একে তাদের বিয়ে হল। চাকরির সন্ধানে তারা চলে গেল বাড়ি ছেড়ে। মিতার বয়স    হল। তার বর চলে গেল পরপারের ডাকে।



আমবাগানে মেজ ছেলে, ছোট ছেলে কে নিয়ে মিতা শেষ বয়সে আনন্দে ছিল। বয়স পঁচাশির কোঠায় হল মিতার। তবু সে মুড়ি ভাজে, বাগান পরিষ্কার রাখে।



মিতা বেশ কিছুদিন ধরে তার এক টি ছেলে সনৎকে দেখতে পায় না। সব ছেলে মেয়েরা মায়ের সঙ্গে দেখা করে কিন্তু সনৎ কেন দেখা করে না। প্রশ্ন করে মিতা সব ছেলে মেয়েদের। কেউ বলে, মা আমি কি করে বলব তার কথা। আবার কেউ বলে, ওর ব্যাপার অই জানে, আমরা জানি না মা।



মিতার কেমন যেন সন্দেহ হয়। সে ভাবে, ছেলেটি কি মরে গেল?  আর দেখা করে না কেন। আবার ভাবে, হয়ত রাগ হয়েছে বলে আসে না। মিতার মনে প্রশ্নগুলো ভিড় করে আসে।



ময়ুরাক্ষীর ধারে বাড়ি মিতার। ছোট থেকেই এই নদীর বুকেই তার যত অভাব অভিযোগ ছুঁড়ে দেয়। ফাঁকা নদীর ধারে চেঁচিয়ে সে মন হাল্কা করত। আজ মিতার নদীর ধারে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই বাড়িতে বসেই কাঁদে আর নদীকে গোপন কথা বলে।



ছোট ছেলে ছিদাম মদ খাওয়া ধরেছে দাদা মরার পর থেকে। সংসার আর তার ভাল লাগে না। মায়ের কাছে বসে। মা তার হাতপর আংটি দুটি হাত দিয়ে দেখে। ছিদাম কথা বলে না। শুধু মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মা, তার না বলা কথা কেমন করে বুঝে যায়। মা বলেন, ভাল করে সংসার কর। শরীরের যত্ন নিও। আর তারপরেই বলেন, হারে ছিদাম তোর দাদা সনৎ আর দেখা করে না কেন? 

ছিদাম কি করে বলবে, দাদা মারা গেছে ক্যানসারে। আর এক দাদা ভুগছে রোগে। কখন কি হয়, কেউ জানে না। আর মায়ের বয়স পঁচাশি হল কিন্তু মরার কোন লক্ষণ নেই। ছিদাম ভাবে, কেউ চায় না মা মরুক। কিন্তু দাদারা মরার লাইনে নাম লিখিয়েছেন। ছিদামের শরীরও ভাল নেই। মা পুত্রশোক পেলে বাঁচবেন না। কোনও ছেলে বলে না। ছিদাম ঠিক করে নিল, আজ সে বলবে মাকে সমস্ত ঘটনা। মা মরে যায় যাবে?  মরবে না বেঁচে যাবে। সে ভাবে, রাতে হেগে মুতে বিছানায় মাখামাখি। মদ খাই বলে পরিষ্কার করতে  পারি। আর কেউ মায়ের ঘরের দিকে আসে না। বৌ, ভাইঝি,ভাইপোরা কাজ নিয়ে থাকে। আবার রাধামাধবের মন্দির আছে। ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার আছে। এমতাবস্থায় কাউকে দোষারোপ করা যায় না।



ছিদাম ভাবে আজ বলবেই মাকে আসল ঘটনা। বাইরে একবার বেরিয়ে এল। কোঁচর থেকে প্লাষ্টিকের বোতল বের করে তরল পদার্থের সবটুকু গলায় ঢেলে দিল। তারপর আয়েশ করে একটা বিড়ি ধরাল।



ঘরে ঢুকতেই মা বলল,আয় ছিদাম এখানে বোস। এঘরে ছিদামই বেশি আসে। আর ছিদামের গায়ের গন্ধ মায়ের চেনা হয়ে গেছে। ছিদাম জানে, মা এবার প্রশ্ন করবে। ঠিক তাই। মা বললেন ,  বাবা ছিদাম, তুই বল সনৎ কোথায়। সে আসে না কেন?  আর কদিন ধরে ভোলাকে দেখছি না। কি হল তাদের।



ছিদামের নেশা ধরেছে।নেশার ঝোঁকে সে বলল,আরে মা শোন আসল কথা। সনৎদা দুবছর আগে মরে গেছে। আর ভোলাদা আজকালের মধ্যেই সেঁটে যাবে বোধহয়। তুমি বুড়ি হয়েছ বলে কেউ বলে না। আমি বলে ফেললাম। ক্ষমা করে দিও। তবে মা, এবার তোমার মরাই ভাল। আর বেঁচে থাকলে কষ্ট পাবে গো, বলেই ছিদাম বাইরে তালা লাগিয়ে চলে গেল।



সকাল সকাল উঠে ছিদাম মন্দিরে একটা প্রণাম করে মায়ের ঘরে তালা খুলে পরিষ্কার করবে বলে তৈরি হল। ছিদাম মায়ের গায়ে হাত দিল। মায়ের দেহ ঠান্ডা হয়ে গেছে।



সকলকে ডেকে আনল ছিদাম। মেজদা বললেন, ভাল হল বুঝলি ছিদাম। ছেলে মরার দুঃখটাতো পেল না। নাকি বল বৌমা।



নাতি নাতনিরা ঠাকুমাকে ভালবাসত। তার ফুলের মালা দিয়ে সাজাল।

ছিদাম একা তাকিয়ে থাকল মায়ের মুখের দিকে। সে দেখতে পেল, মা তাকে  যেন হেসে বলছে, তুই আমাকে মুক্ত করলি ছিদাম।

শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২০

সর্বজিৎ কর্মকার








ভারতবর্ষ


.     

রাস্তার ধারের ডাস্টবিন থেকে যেদিন বাচ্চাবাচ্চাটাকে পাওয়া গেছিল সেদিন সকলের মধ্যে এক দূর্গা মন্দিরের পূজারী,  আর এক মসজিদের মৌলবী সাহেবও দেখতে গিয়েছিলেন ছেলেটিকে । সকলের মত তাদের মনেও সেদিন মায়া জেগেছিল বাচ্চাটার জন্য ।

পূজিরী কেঁদে বলেছিলেন - হা ঈশ্বর ! এরা মানুষ নাকি পাষাণ ! কোন মা পারে এভাবে নিজের সন্তানকে ডাস্টবিনে ফেলে যেতে!  নাড়ির টানকে এভাবে মিথ্যা করে দিতে পারল কীভাবে!

 মৌলবী সাহেবও আকাশের দিকে দুহাত তুলে বলেছিলেন- আল্লাহ রসূল;  এ কেমন ইনসান তুমি বানালে ? এদের ক্ষমা করোনা আল্লা ; এদের নসীবে তুমি জাহান্নুম লিখে দাও !

কিন্তু , স্নেহের বশবর্তী হয়ে যখন শিশুটিকে কোলে তুলে নেয় পাড়ার এক হিন্দু বাড়ির বউ , পূজারী ধমক দিলেন -

কার না কার বাচ্চা । নাম জানোনা , জাত জানোনা কোলে তুলে নিলে ! শিগ্গির নামাও , নাহলে দিয়ে দাও ওই মৌলবী সাহেবদের বিরাদ্রীর কাউকে , যারা মানুষ করবে ওকে !

শুনেই এক মুসলিম মহিলা এগিয়ে এলেন । বাচ্চাটার দিকে হাত বাড়াতেই গর্জে উঠলেন -  না ! আমাদের কেউ নেবেনা এই বাচ্চাটাকে ! না জানে কোন ঘরের , কোন বংশের পাপ !  নামিয়ে দাও ওকে ! পৌরসভার লোকেরা ওকে দিয়ে আসুক হাসপাতালে !

বাচ্চাটি অবিরত কেঁদেই যাচ্ছিল । সকলে মায়াভরা চোখে দেখছিল বাচ্চাটিকে । অনেকের চোখে জলও ছিল । কিন্তু , কেউ এসে তাকে কোলে তুলে নিচ্ছিল না । একটা ক্ষেপি এতক্ষণ লক্ষ্য করছিল এই সবকিছু । শেষমেষ ছুটে আসে সে । সকলকে টেনে সরিয়ে দিয়ে কোলে তুলে নেয় বাচ্চাটাকে । তারপর রাস্তার ধারেই বসে নিজের বুকের দুধ খাওয়াতে শুরু করে ।

পূজারী- মৌলবী দুজনেই হতবাক ।

কিরে বাচ্চাটা তোর নাকি কোথাও থেকে চুরি করে এনেছিস ? বল কে এই বাচ্চা ?

 ক্ষেপিটা হাসতে হাসতে শুধু বলেছিল - এ ভারতবর্ষ গো ! আমাদের ভারতবর্ষ !

সম্পাদকের কলমে

মাস আসে মাস যায়। বছর গড়ায় বুলেট ট্রেনের গতিতে। নিরীহ মানুষ, হাভাতে মানুষ, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ থাকে তার নির্দিষ্ট ঘূর্ণি আবর্তে। পৃথিবীর...